রাঙামাটি । রোববার, ২৩ জুন ২০২৪ , ৮ আষাঢ় ১৪৩১

নিউজ ডেস্কঃ-

প্রকাশিত: ১১:৩৪, ২২ আগস্ট ২০২৩

আগামী বছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য খাতে আসছে বড় বিনিয়োগ

আগামী বছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য খাতে আসছে বড় বিনিয়োগ

শিল্পসহ নানা খাতে বাংলাদেশকে এখন বিনিয়োগের জন্য উত্তম বিবেচনা করছে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প খাতের এর আগে নানা বিনিয়োগ আসলেও এবারই প্রথম স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে উন্নতমানের একটি হাসপাতাল গড়ার। পাশাপাশি বন্ধুরাষ্ট্র চীন ও সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ কিংবা থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের মানের হাসপাতাল গড়তে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের কাছে। এর বাইরে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক এবং সৌদি আরবও। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শুরুতেই স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশগামী রোগীর সংখ্যা কমার পাশাপাশি দেশের চিকিৎসাসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলেও মত তাদের।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের ডিসান গ্রুপ জানায়, বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে তারা। এ জন্য তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় জায়গা দেখছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সজল দত্ত। এ সময় তিনি বলেন, ভারতে মানুষ চিকিৎসার জন্য যায়। তার অন্যতম কারণ ভালো চিকিৎসা যেন ন্যায্য দামে হয়। কেন কলকাতা, শিলিগুড়ি বা পশ্চিম বাংলা? কাছে, একই ভাষা, একই খাওয়া-দাওয়া, একই কালচার। সুতরাং বাংলাদেশের যারা আসেন নিজের বাড়ি মনে করেই আসেন। সেটা অন্য জায়গায় গেলে হয়তো তাদের অসুবিধা ছিল। তিনি বলেন, আমাদের ৫০ শতাংশের বেশি রোগী যাদের আমরা মেডিক্যাল ট্যুরিস্ট বলি, তারা বাংলাদেশ থেকে যায়। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করব। হাসপাতাল একটি বড় বিনিয়োগের বিষয় লং টাইম সার্ভিসের জন্য।

তিনি বলেন, মূলত চারটি সমস্যা নিয়ে আমাদের এখানে বাংলাদেশী রোগী বেশি যায়। এর মধ্যে কার্ডিয়াক, ক্যান্সার, নিউরো আর গ্যাস্ট্রো সমস্যা নিয়ে। আমরা যেটা ভাবছি এ হাসপাতাল সেটআপ করতে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দেব। যাতে এ ধরনের রোগী বাংলাদেশের বাইরে না যায়।

বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সজল দত্ত বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে হাসপাতালের কাজ শুরু হবে। এখানেই বিশ্বমানের হাসপাতাল হবে। সরকার আমাদের হাসপাতাল  তৈরিতে খুবই উৎসাহী। এ হাসপাতালে অবশ্যই বাংলাদেশী চিকিৎসকরা বড় ভূমিকা রাখবেন। আর ভারত  থেকেও কিছু চিকিৎসক আসবেন। বড় হাসপাতাল হলে বাংলাদেশের বাইরে থাকা অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও  দেশে ফিরে আসার সুযোগ পাবেন। যাদের সামর্থ্য আছে বাংলাদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তারাই যান। তবে নতুন যে হাসপাতাল বাংলাদেশে হবে সেখানে যাতায়াত খরচ, থাকা, খাওয়া অনেক কমে যাবে।

এর বাইরেও চীন, তুরস্ক ও সৌদি আরবের কাছ থেকে আলাদাভাবে হাসপাতাল তৈরির প্রস্তাব আসে করোনার সময়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ড (বিডা) সূত্রে জানা যায়, তিনটি প্রস্তাবই বিবেচনাধীন থাকলেও চীনের প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল। যা নিয়ে সম্প্রতি আবারও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যত মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তাদের কথা মাথায় রেখেই এ দেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করেছে কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে চীন সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের আদলে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরি করতে চায় বলে তাদের প্রস্তাবনায় বলেছে। ঢাকার আশপাশে জমি না পেলে বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরেও যেতে রাজি আছে চীন। তবে জমির নিশ্চয়তা চায় দেশটি।

কিন্তু তুরস্ক ও সৌদি আরব ঢাকার আশপাশে জায়গা চেয়েছে বলে জানা গেছে। তিন দেশ আলাদাভাবে হাসপাতাল তৈরির আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত কয়টা হাসপাতাল হবে, সেটি এখনো নিশ্চিত হয়নি জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার খুরশিদ আলম জনকণ্ঠকে বলেন, তারা প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে। সরকার তাদের প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই চলছে। সব দেশকেই হাসপাতাল করার জায়গা  দেওয়া যাবে কি না তাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সময় হলেই সব জানানো হবে।

তবে চার দেশই তাদের প্রস্তাবে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যত মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তাদের কথা মাথায় রেখেই এ দেশে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছে তারা।

করোনার সময় দেশগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে চীন প্রস্তাব পাঠিয়েছিল জানিয়ে বিডার মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব জনকণ্ঠকে বলেন, চীনের চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) হাসপাতাল করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবগুলো আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছিল। যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আপত্তি না থাকলে তা হলে আমাদের ছাড়পত্র দিতে কোনো সমস্যা নেই।

চীনের সিএমইসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভাগ বা জেলা পর্যায়ে একটি করে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করতে চায় তারা। সব মিলিয়ে তারা মোট ৫০ হাজার শয্যার হাসপাতাল করতে চায় বাংলাদেশে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ ও থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের আদলে হাসপাতাল করার আগ্রহ সিএমইসির। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের তুলনায় তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ অনেক কম হবে বলেও প্রস্তাবনায় তুলে ধরা হয়। চীনের ওই প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত হাসপাতাল হবে পুরোপুরি অনলাইননির্ভর। হাসপাতালে ৭০ শতাংশ চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে বাংলাদেশ থেকে। বাকি ৩০ শতাংশ বাংলাদেশের বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণে গড়ে তোলা হবে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। হাসপাতাল নির্মাণের আগে সব ধরনের সমীক্ষা করবে সিএমইসি। তাদের মতে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে তুরস্কের বিনিয়োগের বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।  দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়। তারই ধারাবাহিকতায় একটি হাসপাতাল তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি। একইভাবে সৌদি আরবের ইঞ্জিনিয়ারিং ডাইমেনশনও বাংলাদেশে হাসপাতাল গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়।

কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে বেড়েছে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ। এরই প্রেক্ষিতে দেশেও গড়ে উঠেছে নানা ধরনের হাসপাতাল। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা। ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যাচ্ছেন অনেক মানুষ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর পাঁচ লাখ মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এর বড় অংশই যায় ভারতে।

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্রাইভেট হসপিটালস সূত্রে জানা যায়, গত বছর যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবার জন্য দেশের বাইরে গেছে তাদের শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া প্রতিটি রোগী ভ্রমণ, থাকা-খাওয়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অদক্ষতা ও আস্থার সংকটে বিদেশে যাচ্ছে রোগীরা। ভারত ছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরেও যাচ্ছে চিকিৎসার জন্য। দেশের অভ্যন্তরে এমন উন্নতমানের বিদেশী হাসপাতাল হলে রোগীদের দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমার পাশাপাশি দেশের অর্থ দেশেই থাকবে বলে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ্ জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও অনেক উন্নত হয়েছে।

আমরা করোনার সময় দেখেছি আমাদের চিকিৎসক-নার্সরা কিভাবে আন্তরিকতা দিয়ে মানুষকে সেবা দিয়েছেন। এখন ডেঙ্গুর প্রকোপেও দেখছি চিকিৎসকরা দিনরাত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। কিন্তু তার পরও কিছু সীমাবদ্ধতা তো আমাদের রয়েছেই। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রয়েছে জনবলের ঘাটতি। রোগীর তুলনায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেশিনারিজের সংকট। আর তাই মানুষজনকে সঠিক চিকিৎসা পেতে বেগ পেতে হয়। আর তাই কিছু রোগী বিদেশে চলে যায় উন্নত চিকিৎসার আশায়। কিন্তু যদি বিদেশের হাসপাতালগুলো বা ওই দেশগুলোর মানের হাসপাতাল বাংলাদেশেই হয় তা হলে রোগীদের বিদেশ যাওয়া প্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে। আর আমাদের দেশীয় হাসপাতালগুলোও বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে কে কার চাইতে ভালো চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে। এতে করে সব মিলিয়ে ভালোই হবে বলে আমার মনে হয়।