রাঙামাটি । রোববার, ২৩ জুন ২০২৪ , ৮ আষাঢ় ১৪৩১

খায়রুল বাশার আশিক, বিশেষ প্রতিবেদনঃ-

প্রকাশিত: ১০:৩০, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পাল্টেছে কাল, নারী ধরেছে হাল

পাল্টেছে কাল, নারী ধরেছে হাল

দিনভর খাটুনি, অতঃপর সন্ধ্যারাতেই ঘুম। পরদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙবে। সকাল থেকেই শুরু হবে নতুন কর্মযজ্ঞ। গৃহপালিত পশুগুলোকে মাঠে চরানো, হাঁস-মুরগির খাবার দেওয়া, ধান সিদ্ধ করা, রোদে ধান শুকানো, ধানগুলো নেড়ে দেওয়া, সঙ্গে পরিবারের জন্য রান্নার জোগান দেওয়াসহ হরেক কাজ সামলাতে হয় গ্রামীণ নারীকে। এমন কর্মগল্প কোনো একজন নারীর নয়, গ্রামে এমন অগণিত নারী প্রতিনিয়ত আঁচলে আগলে রাখেন সংসার-পরিবার। শুধু ঘরের কাজ নয়, ঘরের বাইরে সব কাজেও গ্রামীণ নারীর পদচারণা আজ সমৃদ্ধ করে চলেছে সমাজকে। এখন যে যুগ পাল্টেছে, সর্বত্র এসেছে নারী-পুরুষের সমঅধিকার। 

গ্রামীণ নারীর কর্মপদচারণা দেখলে সহজেই বোঝা যায়, এগিয়েছে দেশ। শুধু শহুরে সমাজেই নয়, গ্রামেও এখন নারীর হাত চলে পুরুষের মতোই। পুরুষের পাশাপাশি সব কাজেই এখন অংশ নিচ্ছেন নারী। কৃষিকাজ, গোখাদ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবারের সব কাজেই সমান অংশীদার নারী। 

কখনো মা, কখনো বোন আবার কখনো ঘরের ঘরণী হয়ে যুগে যুগে পুরুষের পাশে থেকেছেন নারীরা। তবে ঠিক দু’এক দশক আগেও নারীর কর্মবিচরণে ছিল সীমাবদ্ধতা। ঘরের বাইরে গেলেও নারীর জন্য বাধা ছিল নির্দিষ্ট গণ্ডি। এমন কিছু কাজ ছিল- যা শুধু পুরুষরাই করবেন। নারী সেখানে ছিলেন অক্ষম হিসেবে বিবেচিত। পুরুষের এমন একটি কাজ ছিল খালে-বিলে নৌকা চালানো। নৌকার বৈঠা ধরার কোনো অধিকার ছিল না নারীর। তবে আজকাল গ্রামে পুরুষের মতোই নৌকার হাল ধরেন নারীও। এ যেন এক ছবির গল্প বা গল্পের ছবি।

উপকূলের অনেক অঞ্চলে প্রতিদিন নানা প্রয়োজনে ব্যবহার হয় নৌকা। গত দুই দশক আগেও নৌকা চালানোর দায়িত্ব ছিল পরিবারের কর্তার ওপর। কিন্তু ব্যবসা, কৃষি বা অন্য কোনো কারণে পরুষ যখন বাড়ি থেকে দূরে অবস্থান করতেন, তখন নানা বিড়ম্বনায় পড়ত পরিবারের নারী ও শিশুরা। তবে আজ পুরুষের অপেক্ষায় না থেকে গ্রামীণ নারীরা নৌকা চালাচ্ছেন।

সরেজমিন উপকূলীয় গ্রামগুলোয় দেখা গেছে, শিশুদের নৌকায় করে স্কুলের ঘাটে পৌঁছে দেওয়া, গোখাদ্য সংগ্রহ করে নৌকায় বয়ে আনা কিংবা নৌকা নিয়ে বাজার-সদাই করা এখন নারীদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্রামীণ নারীও যে নৌকার মাঝি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, তা প্রমাণ করেছেন তারা। 

পুরুষের পাশাপাশি হাতে হাত মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নারীর পদচারণা এখন সুস্পষ্ট। গ্রামে নারীদের কাজের পরিধিও বেড়েছে। প্রান্তিক গ্রামগুলোতেও নারী-পুরুষের কর্মক্ষেত্রের আলাদা কোনো শ্রেণি বিভাজন নেই। 

আজ নারীর হাতেও গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘোরে। কৃষি, কুটির শিল্প, আত্মকর্মসংস্থান, ব্যবসা, চাকরিসহ যেকোনো অর্থনৈতিক অঙ্গনে পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমানতালে কাজ করেন। গ্রামীণ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংগ্রহণ পুরুষের সমান। 

এসব দৃশ্য যেন সাক্ষ্য দেয়, আইনে অজ্ঞতা, অধিকার অসচেতনতা, গতানুগতিক ভাবধারা, ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস, ফতোয়া, পর্দা প্রথার বেড়াজাল বা কুসংস্কারের মতো সমাজকেন্দ্রিক বিষয়গুলো পায়ে ঠেলে প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের নারীরা। এর পাশাপাশি নারীর অধিকার সম্পর্কেও এখন সচেতন তারা। জমিজমা ভাগ-বণ্টনসহ বিভিন্ন অংশীদারিত্বে গ্রামেও নারীদের অবস্থান সুদৃঢ়। দেশ ও সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গ্রামে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে গ্রামের নারীরা আগের চেয়ে সচেতন।

প্রান্তিক গ্রামীণ জনপদের নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামে প্রযুক্তির ছোঁয়া ও পুরো জনপদের মানসিকতার উন্নয়নের ফলে ধর্মীয় গোঁড়ামি কমেছে। সমাজের সর্বত্র নারীর অংশগ্রহণে এখন আর খুব বেশি বাধা আসে না ধর্মীয় দিক থেকে। কর্মক্ষেত্রে নারীর বিচরণের বিপক্ষে কমে এসেছে ফতোয়া। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোতেও জাত-বিভেদ কমে এসেছে। প্রাচীন গোত্র চিন্তার অবসান ঘটেছে। কাজের প্রয়োজনে সব গোত্রের মানুষ অংশ নিচ্ছে সবক্ষেত্রে। ফলে নারীর সর্বাঙ্গীণ চলাচলে স্বাধীনতা এসেছে। এছাড়া গ্রামের প্রতিটি পরিবার শিশু শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবারের নারী সদস্যের অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। 

এত সম্ভাবনার মধ্যেও গ্রামকেন্দ্রিক পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীর পথচলাকে বারবার বাধা দেয়। পরিবেশ, অবকাঠামোগত অপর্যাপ্ততা, প্রযুক্তির দুর্লভ প্রাপ্যতা, দুর্যোগ ঝুঁকি, যৌতুক প্রথাসহ নানা সামাজিক সমস্যা নারীর জীবনমান উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

উপকূলের নারী উন্নয়নের আরো একটি বাধা বাল্যবিয়ে। মেয়ের বয়স ১৪-১৫ হলেই শুরু হয় পাত্র দেখা, এরপর বিয়ের আয়োজন। অতঃপর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মা ও শিশু। এছাড়া কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে পুরুষের বেকারত্ব নারীর জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামে পুরুষের বেকারত্বের ফলেই এখনো পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না যৌতুক প্রথা।

বরগুনা সুজার খেয়াঘাট আশ্রয়ণ প্রকল্পের নারী বাসিন্দা রীনা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামীর মতোই পরিবারের প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজ করি। আশপাশের অনেক নারীই যে যার মতো রোজগারের চেষ্টা করেন। তবে গ্রামে নারীর কাজের মূল্য একটু কমই। তবুও নারীরা থেমে থাকেন না।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীর জন্য কর্মবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই কমে আসবে নারী-পুরুষ অসমতা। তবে নারীসমাজের এমন অবিরাম ছুটে চলার প্রবণতাকে ইতিবাচক রূপে দেখছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নারীর দৃষ্টিভঙ্গির এমন ইতিবাচক পরিবর্তন পুরো দেশকে অগ্রসর করছে। গ্রামীণ পরিবারগুলোকেও অনেক বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দিচ্ছে, কাজে এসেছে তৎপরতা। এর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিও জোরদার হচ্ছে দিন দিন।

‘নারীর জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক বিষয়ে কথা হলে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক নুসরাত জাহান বলেন, ‘নারীর জীবনযাত্রায় উন্নয়নশীল এই পরিবর্তন একটি জাতির পথচলায় আশার সঞ্চার ঘটায়। অন্যদিকে গ্রামীণ নারীর কর্মউদ্যম সারাদেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক। নারী ও শিশু শিক্ষার ধারা ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং গ্রামের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে নারীর জীবনে আসবে নতুন নতুন হাজারো কর্মদক্ষতা।’